কওমি মাদ্রাসা: ঐতিহ্য রক্ষা ও যুগোপযোগী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

সম্পাদকীয় ৭ আগস্ট ২০২৬ ৩০৭২

বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক ভূমিকার পাশাপাশি বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিশু সুরক্ষা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও পাঠ্যক্রম সংস্কারের তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

কওমি মাদ্রাসা: ঐতিহ্য রক্ষা ও যুগোপযোগী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশে কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে নানা ধরনের বিপরীতমুখী আলোচনা দেখা গেলেও এর প্রকৃত রূপ ভিন্ন। নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘকাল ধরে দেশে ইসলামি চর্চা, নীতি-নৈতিকতা প্রসার এবং আলেম তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। অতীতে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা বেশি থাকলেও বর্তমানে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি বহু প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত উন্নয়ন ঘটেছে।

সমাজতাত্ত্বিক দিক থেকে কওমি মাদ্রাসা নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্থানান্তরের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কাজ সম্পাদন করে। এখানে অত্যন্ত কম খরচে ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে পড়াশোনা ও আবাসিক পরিবেশে চরিত্র গঠনের সুযোগ রয়েছে। তবে ইদানীং কিছু প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের মতো গুরুতর অপরাধের নজির সামনে এসেছে। যদিও এসব ঘটনা পুরো ব্যবস্থাকে প্রতিফলিত করে না, তবুও এটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থায় বড় ধরনের ফাটল ধরাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শিশু নির্যাতনের মতো ব্যাধি কেবল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়; বিদ্যালয়, ক্রীড়া সংস্থা কিংবা পরিবারেও এমন ঘটনা ঘটে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব, দুর্বল জবাবদিহি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণেই মূলত এ জাতীয় অপরাধের সুযোগ তৈরি হয়। আবাসিক ব্যবস্থার কারণে শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের অত্যধিক নির্ভরতা থাকে, যা জবাবদিহি না থাকলে ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই একক কোনো মাধ্যমকে কাঠগড়ায় না তুলে শিশু সুরক্ষার অংশ হিসেবে এর সমাধান খোঁজা উচিত।

সমস্যা মোকাবিলায় কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের সুস্পষ্ট শিশু সুরক্ষা নীতি, শিক্ষকদের জন্য আচরণবিধি ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। গোপন অভিযোগ কেন্দ্র, নিরপেক্ষ তদন্ত ও অপরাধিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া নৈতিক দায়িত্ব। পাশাপাশি এক প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত শিক্ষক যাতে অন্য জায়গায় নিয়োগ না পান, সে জন্য শিক্ষক নিবন্ধন ও কেন্দ্রীয় তদারকি কাঠামো চালু করা দরকার।

ইসলামি মূল শিক্ষার গভীরতা বজায় রেখে সাধারণ শিক্ষা যেমন—বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও আইন পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিশু মনস্তত্ত্ব ও প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। একই সঙ্গে শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন ও ভালো কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। ঐতিহ্য ও সময়োপযোগী পরিবর্তনের সমন্বয় ঘটিয়েই কওমি মাদ্রাসা তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।

আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন দিন