মব সংস্কৃতি ও প্রফেসর ইউনূসকে বিদেশে অপদস্থ করার নেতিবাচক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ২৮১৩

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়া মব সংস্কৃতির ক্ষতিকর প্রভাবের চিত্র সামনে এসেছে।

মব সংস্কৃতি ও প্রফেসর ইউনূসকে বিদেশে অপদস্থ করার নেতিবাচক প্রেক্ষাপট

মনোবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রচিন্তায় ব্যক্তি ও উন্মত্ত জনতার মানসিকতার তফাত দীর্ঘকাল ধরে আলোচিত। গুস্তাভ ল্য বঁ, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, এলিয়াস কানেত্তি, ওর্তেগা ই গাসেত এবং হানা আরেন্টের গবেষণা অনুযায়ী, সমষ্টির অংশ হলে মানুষের নিজস্ব বিবেক লোপ পায় এবং আবেগ ও উগ্রতা প্রাধান্য পায়। হানা আরেন্ট সুসংগঠিত জনগণকে মব থেকে পৃথক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে ইবনে খালদুন ও মেকিয়াভেলির মতে, জনতার এই চঞ্চলতা ও অনিয়ন্ত্রিত আবেগ সমাজ ও সভ্যতার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণজাগরণে স্বৈরাচারবিরোধী ক্ষোভের পেছনে যৌক্তিকতা থাকলেও, সেই সুযোগে ছদ্মবেশে কিছু দুর্বৃত্ত ব্যক্তির বাসস্থানে হামলা, ভাঙচুর ও প্রকাশ্যে লোকজনকে লাঞ্ছিত করছে। ঢাকার গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এসব ঘটনা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য। সংবাদ যাচাই না করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা এবং যথেচ্ছ শাস্তি দেওয়া রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি ইসলামী মূলবোধের কঠোর পরিপন্থী।

সাম্প্রতিক সময়ে নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে হুইলচেয়ারে থাকা নোবেলজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে একদল লোক অশ্লীল স্লোগান দেয় ও হেনস্তা করে। এর পূর্বে ইতালিতেও একই রূপ আচরণ দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখা ইউনূসের এই অবমাননা আন্তর্জাতিক দরবারে বাংলাদেশের সম্মান ক্ষুণ্ণ করে।

ইতিহাস জুড়ে মব সহিংসতার রূপ দেখা গেছে। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় মাত্র ১০০ দিনে ৮ লাখ মানুষের গণহত্যা, নাৎসি জার্মানির ধ্বংসাত্মক তাণ্ডব, যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদের কারণে গণপিটুনি এবং ফরাসি বিপ্লবের নির্মমতা এর বড় উদাহরণ। আধুনিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে উদ্ভূত ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল মবও একইরকমভাবে সমাজে চরম অস্থিরতা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

সামাজিক জীবনে সম্মানিত ব্যক্তি বা সাধারণ কিশোরের ওপর মিথ্যা অভিযোগে হামলা রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। ফরাসি চিন্তাবিদ আলেক্সি দ্য তকভিলের সংজ্ঞায়িত ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্র’ প্রতিহত করতে গণমাধ্যম ও সচেতন সমাজের সমন্বয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে।

আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন দিন