মহাসড়কে রাতে বেপরোয়া ডাকাত দল, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চরম আতঙ্কে যাত্রীরা
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নির্জন স্থানে রাত নামলেই সক্রিয় হয়ে উঠছে ডাকাত চক্র। যাত্রী ও চালকদের জিম্মি করে মালামাল লুটে নেওয়া ঠেকাতে টহল জোরদার ও নজরদারি বাড়িয়েছে পুলিশ।

দেশের বিভিন্ন রাজপথে রাতের বেলা দূরপাল্লার বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্যবাহী যানবাহনে ডাকাতির ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সেতু, টোলপ্লাজার নিকটবর্তী এলাকা এবং নির্জন সংযোগ সড়কগুলোতে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য চরমে পৌঁছেছে। কখনো পুলিশের ছদ্মবেশে, কখনো সাধারণ যাত্রী সেজে কিংবা সরাসরি দেশীয় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এসব ডাকাতির ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।
কুমিল্লা অঞ্চলের প্রায় ১০৫ কিলোমিটার সড়ক এলাকায় রাত ৯টার পর থেকে চলাচলে চরম নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিচ্ছে। দাউদকান্দি, আমিরাবাদ, বলদাখাল, গোমতা ও চান্দিনার বিভিন্ন স্থানে ডাকাত দল চলন্ত গাড়ি লক্ষ্য করে রড বা ভারী বস্তু নিক্ষেপ করে চাকা বিকল করে দিচ্ছে। আবার কোথাও কৃত্রিম যানজট তৈরি করে যানবাহন আটকানো হচ্ছে। গত ২২ ও ২৬ সেপ্টেম্বর চান্দিনার নুরীতলায় গাড়িতে রড মেরে ডাকাতির চেষ্টা করা হয়, যার একটির শিকার হন চৌদ্দগ্রামের বাসিন্দা আবদুর রহিম। এছাড়া চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি রাতে বলদাখাল এলাকায় ইউটার্নে ব্যারিকেড দিয়ে আকতার হোসেন নামের এক প্রবাসী যাত্রীর সব মালামাল লুট করা হয়। পরবর্তীতে ৬ জানুয়ারি গোমতা স্কুলের সামনে রড মেরে আবুল কালাম আজাদ নামের এক ঠিকাদারের গাড়ি বিকল করে সর্বস্ব কেড়ে নেয় অপরাধীরা।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম অংশের সিটি গেট থেকে মিরসরাইয়ের ঘুমঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত ৭০ কিলোমিটার এলাকায় ডাকাতির কৌশল কিছুটা ভিন্ন। সীতাকুণ্ডের কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, ভাটিয়ারি এবং মিরসরাইয়ের কমলদহসহ বেশ কিছু এলাকায় চলন্ত যানবাহনে লোহার পাইপ ও ভারী বস্তু ছুঁড়ে গাড়ি থামানো হয়। অনেক সময় ডাকাত সদস্যরা নিজেদের গাড়ি নষ্ট হওয়ার নাটক সাজিয়ে সাহায্যের অপেক্ষার ভান করে অন্য গাড়ি থামিয়ে লুটপাট চালায়। গত ৯ মে রাতে নুনাছড়ায় এক বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসে অস্ত্রের মুখে ডাকাতি করে স্বর্ণালংকার, ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এর আগের দিন রাতে সীতাকুণ্ডের তুলাতলীতে পুলিশ সদস্য বহনকারী একটি গাড়ি ডাকাতির কবলে পড়লে ঘটনাস্থলেই এক ডাকাতকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া হয়ে কুমিল্লার চান্দিনা পর্যন্ত বিগত ছয় মাসে অন্তত ১০০টি ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তবে এই সময়ে মামলা দায়ের হয়েছে মাত্র ২৩টি। আইনি ঝামেলা এড়ানো এবং মালামাল ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকায় অনেকেই লিখিত অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকেন। এছাড়া অনেক সময় মূল ডাকাতির পরিবর্তে চুরি বা সাধারণ ডায়েরি হিসেবে নথিভুক্ত করার কারণে অপরাধের প্রকৃত চিত্র আড়াল হচ্ছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।
অপরাধ দমনে তৎপরতার বিষয়ে মুন্সিগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মেনহাজুল আলম জানান, সার্বক্ষণিক টহল নিশ্চিতে জেলা ও হাইওয়ে পুলিশ একযোগে কাজ করছে। ভবেরচর হাইওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. শাহ কামাল আকন্দ জানান, গত ৫ বছরে এসব অপরাধে যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখতে একটি বিশেষ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ জানান, সীমিত জনবল সত্ত্বেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্যামেরা স্থাপন ও যৌথ টহলের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এদিকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বিভিন্ন সংযোগ সড়কে সক্রিয় থাকা ৩০ জন ডাকাতকে গত ২১ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সোনারগাঁ থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুল বারিক।
