ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের সূচনা ও ঐতিহাসিক বিবর্তন
ইসলামের শুরুর যুগে প্রচলিত না থাকলেও চতুর্থ হিজরি শতকে ফাতেমীয় আমলে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন শুরু হয়। পরবর্তীতে ইরাক ও মোগল আমলে এটি উপমহাদেশসহ বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রসার লাভ করে।

'ঈদ' শব্দের অর্থ আনন্দ বা উৎসব এবং 'মিলাদ' বলতে বোঝায় জন্মের সময় বা জন্মবার্ষিকী। সে হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র আগমনে আনন্দ প্রকাশ করাকে ঈদে মিলাদুন্নবী বলা হয়। বিশ্বনবীর সামগ্রিক জীবন আদর্শ চর্চাকে সিরাতুন্নবী বলা হয়, যা পালনের মধ্য দিয়ে জন্মবৃত্তান্ত স্মরণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এই উদযাপন নিয়ে মুসলিম সমাজে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা থাকলেও রাসুল (সা.)-এর জীবন অনুসরণ করাকে ইসলামের মূল বার্তা হিসেবে গণ্য করা হয়।
ইতিহাস গবেষক ও হাদিস বিশারদদের মতে, মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায়, খোলাফায়ে রাশেদিন কিংবা তাবেঈদের যুগে মিলাদুন্নবী উদযাপনের কোনো নজির ছিল না। হিজরি চতুর্থ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মিসরের ফাতেমীয় শাসক মুয়িজলি দিনিল্লাহর আমল থেকে ১২ রবিউল আউয়ালে সর্বপ্রথম এই প্রথা চালু হয়। ১৭৩ হিজরিতে আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের মা খায়জুরান বিবি মক্কায় মহানবীর জন্মস্থানে জিয়ারত ও দোয়া করার নিয়ম চালু করেন, যা পরবর্তীতে প্রতি বছর উদযাপিত হতে থাকে।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে এই প্রথায় বিরতি এলেও ৫১৫ হিজরিতে ফাতেমীয় খলিফা আমির বিল আহকামিল্লাহ এটি পুনরায় চালু করেন। তবে ইরাকের এরবিলের শাসক আবু সাঈদ মুজাফফর উদ্দিন কুকুবুরি ৬০৪ হিজরিতে সুন্নিদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ও ব্যাপকভাবে এই উৎসব উদযাপনের ব্যবস্থা করায় তাকেই এই আয়োজনের অন্যতম মূল রূপকার মনে করা হয়। এই বিষয়ে স্পেনের প্রখ্যাত পণ্ডিত আবুল খাত্তাব ওমর ইবনে হাসান ইবনে দেহিয়া আল কালবি প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন।
ভারতীয় উপমহাদেশে মোগল আমলে এই প্রথার বিকাশ ঘটে। মোগল সম্রাট হুমায়ুন, আকবরের মা এবং অভিভাবক বৈরাম খাঁ এটি প্রচলনে ভূমিকা রাখেন। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহের সময়ে সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই পালনের ব্যাপ্তি আরও বাড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু মুসলিম দেশে প্রতি বছর যথাযোগ্য মর্যাদায় ও আনুষ্ঠানিকভাবে দিনটি পালিত হয় এবং সরকারি ছুটিও বহাল রয়েছে।
